পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক ছতুরাভী (র): জীবন ও কর্ম

উপমহাদেশে ইসলামের শাশ্বত বাণী প্রচার, সমাজসংস্কার, আত্মশুদ্ধি এবং ইলমে দ্বীনের বিকাশে যাঁরা অসামান্য অবদান রেখে গেছেন, তাঁদের মধ্যে পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক ছতুরাভী (রহ.) অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত ভাষাবিদ, বিশিষ্ট গবেষক, আধ্যাত্মিক সাধক, সুফি ব্যক্তিত্ব এবং ফুরফুরা শরীফের মহান সিলসিলার অন্যতম প্রধান খলিফা।

জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা শিক্ষিত সমাজের কাছে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ, প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তৃতা এবং অসংখ্য যোগ্য শিষ্য আজও তাঁর কর্মজীবনের উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়; বরং হৃদয়ের পরিশুদ্ধি, নৈতিকতা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনই একজন মানুষের প্রকৃত সফলতার পথ।

pir mawlana abdul khaleq chhatura dorbar sharif

জন্ম, বংশপরিচয় ও শৈশব

পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক ছতুরাভী (রহ.) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ছতুরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ফুরফুরা শরীফের ইমাম, মুজাদ্দিদে যামান হযরত পীর আবদুল্লাহ আবু বকর সিদ্দিক (রহ.)-এর অন্যতম প্রধান খলিফা।

তাঁর জন্ম হয় বুধবার, ১৩ ভাদ্র ১২৯৮ বঙ্গাব্দ; ২৪ আগস্ট ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দ; ২৯ মহররম ১৩১০ হিজরি।

শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, অধ্যবসায়ী ও ধর্মপ্রাণ। নিজ বাড়িতেই অতি অল্প সময়ে পবিত্র কুরআন মাজিদ সম্পূর্ণ তিলাওয়াত শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি কুমিল্লার হোচ্ছামিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং সেখানে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে তৎকালীন জামায়াতে উলা (বর্তমান ফাজিল সমমান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

শিক্ষা জীবনের অসাধারণ কৃতিত্ব

মাদ্রাসা শিক্ষা সমাপ্ত করার পর তিনি সাধারণ শিক্ষায়ও সমান সাফল্যের পরিচয় দেন। কুমিল্লার ঈশ্বর পাঠশালায় সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯১৮ সালে এন্ট্রান্স (বর্তমান এসএসসি) পরীক্ষায় ঈর্ষণীয় ফলাফল অর্জন করেন। একই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ১৯২০ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এফ.এ. (বর্তমান এইচএসসি) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর একই কলেজ থেকে ১৯২২ সালে বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ঢাকায় গমন করেন। ১৯২৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এই অসামান্য কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাঁকে পাঁচ ভরি ওজনের একটি স্বর্ণপদক প্রদান করে।

পরের বছরও তিনি একই কৃতিত্ব পুনরাবৃত্তি করেন। আরবি ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ. পরীক্ষায়ও প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন এবং পুনরায় স্বর্ণপদকে ভূষিত হন। একই ব্যক্তির দুই ভিন্ন ভাষায় ধারাবাহিকভাবে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার সে সময়ে ছিল অত্যন্ত বিরল ও গৌরবের বিষয়।

কর্মজীবন ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব

শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পরপরই তিনি ফেনী কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। একই সঙ্গে কলেজের ইসলামিয়া হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্টের দায়িত্বও পালন করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর পাণ্ডিত্য, চরিত্র, কর্মনিষ্ঠা ও শিক্ষাদানের অনন্য দক্ষতা তাঁকে শিক্ষাঙ্গনে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে।

ফেনী কলেজে তাঁর সাফল্যের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের আমন্ত্রণ লাভ করেন। অনেক শুভানুধ্যায়ীর অনুরোধ এবং একই সঙ্গে ফুরফুরা শরীফের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার সুবিধা বিবেচনা করে তিনি ১৯২৭-২৮ সালের দিকে প্রেসিডেন্সি কলেজে যোগদান করেন। দীর্ঘ সময় সেখানে শিক্ষকতা করার পর তিনি লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে সহ-অধ্যক্ষ (Vice Principal) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ঢাকার সরকারি ইডেন কলেজেও ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান সরকার তাঁকে তা’লীমাতে ইসলামিয়া বোর্ডের সম্মানিত সদস্য হিসেবে মনোনীত করে। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা ও ইসলামী নীতিবোধের সমন্বয়ে জাতি গঠনে তাঁর অবদান ছিল প্রশংসনীয়।

পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালের পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্যের দায়িত্বও পালন করেন। একজন আলেম, শিক্ষাবিদ ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও তিনি সততা, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

বায়আত, খিলাফত ও আধ্যাত্মিক জীবন

আধ্যাত্মিক জীবনের সূচনা

অধ্যাপনা জীবনের শুরুতেই আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাসাউফ ও আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করেন। ফেনী কলেজে শিক্ষকতা করার সময় তিনি ফুরফুরা শরীফের অন্যতম প্রধান খলিফা হযরত শাহ সূফী সদরুদ্দীন আহমদ (রহ.)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে তাঁর নিকট থেকেই খিলাফত লাভ করেন।

একদিন শাহ সূফী সদরুদ্দীন আহমদ (রহ.) তাঁকে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ একটি কথা বলেন—

“আমার যা দেওয়ার ছিল, তোমাকে তা দিয়েছি; কিন্তু তোমার পাত্র এখনো পূর্ণ হয়নি। তুমি আমার মুর্শিদের কাছে গিয়ে বায়আত গ্রহণ করো।”

এই নির্দেশ ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

ফুরফুরা শরীফে বায়আত ও খিলাফত লাভ

মুর্শিদের নির্দেশে তিনি ফুরফুরা শরীফে উপস্থিত হয়ে হযরত আবদুল্লাহ আবু বকর সিদ্দিক (রহ.)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন এবং তাঁর কাছ থেকেও খিলাফতের মহান মর্যাদা লাভ করেন।

তবে এত বড় আধ্যাত্মিক মর্যাদা লাভের পরও তিনি ছিলেন অসাধারণ বিনয়ী। নিজের শাজরানামায় তিনি লিখতেন—

“শেষোক্ত দুইজন হইতে খেলাফত প্রাপ্ত।”

তিনি কখনো একজনকে অন্যজনের ঊর্ধ্বে স্থান দেননি; বরং উভয় মুর্শিদকেই তাঁর আত্মিক জীবনের আলোর উৎস হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর ভাষায়—

“মুজাদ্দিদে যামান হযরত মাওলানা শাহ সূফী হাজী মুহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.) এবং তাঁর যোগ্যতম খলিফা হযরত শাহ সূফী হাজী সদরুদ্দীন আহমদ (রহ.)-এর ওসিলায়ই আমি এই অন্ধকার পৃথিবীতে আলোর সন্ধান পেয়েছি।”

মুর্শিদের বিশেষ স্নেহ ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা

পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.) তাঁর মুর্শিদের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ছিলেন। একটি স্মরণীয় ঘটনার মাধ্যমে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

এক আধ্যাত্মিক মজলিসে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রহ.) কিছু দুধ পান করার পর উপস্থিত সকলের মধ্য থেকে বিশেষভাবে প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.)-কে ডেকে অবশিষ্ট দুধ পান করার নির্দেশ দেন। তিনি বিনয়ের সঙ্গে দুধের গ্লাস নিয়ে নিজের স্থানে ফিরে আসতেই উপস্থিত অনেকে বরকতের আশায় দুধ গ্রহণ করতে এগিয়ে আসেন। একপর্যায়ে গ্লাসটি পড়ে গেলে তিনি মেঝেতে পড়ে থাকা দুধও অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে সংগ্রহ করে পান করেন।

এই ঘটনার বর্ণনাকারীরা উল্লেখ করেন, এর পর থেকেই তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাব ও বেলায়েতের খ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

ন’হুজুরের মূল্যায়ন

ফুরফুরা শরীফের শ্রদ্ধেয় ন’হুজুর হযরত শাহ সূফী নাজমুস সায়াদাত সিদ্দিকী (রহ.) একবার তাঁর সম্পর্কে বলেন—

“প্রফেসর সাহেবকে আমার ওয়ালিদ কেবলা বিশেষভাবে শিক্ষা দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, ইংরেজি শিক্ষিত সমাজে তাঁর মাধ্যমে দ্বীনের তাবলিগের কাজ সম্পন্ন হবে। এই সিলসিলায় তিনি একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন।”

বাস্তবেও পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.) তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন শিক্ষিত সমাজের মধ্যে ইসলামের প্রকৃত আদর্শ, আধ্যাত্মিকতা ও আত্মশুদ্ধির বার্তা পৌঁছে দিতে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন—আধুনিক উচ্চশিক্ষা ও গভীর তাসাউফ একে অপরের পরিপন্থী নয়; বরং সঠিকভাবে সমন্বিত হলে উভয়ই মানুষকে সত্য, সৌন্দর্য ও আল্লাহর নৈকট্যের দিকে পরিচালিত করে।

ভালো। নিচে পর্ব–৩ সম্পূর্ণ সাহিত্যিক, প্রাঞ্জল ও ব্লগ-প্রকাশযোগ্য ভাষায় উপস্থাপন করা হলো। মূল তথ্য অপরিবর্তিত রেখে ভাষা, বানান ও উপস্থাপনা পরিমার্জন করা হয়েছে।

সাহিত্যকর্ম, খলিফাবৃন্দ ও নেদায়ে ইসলাম

জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যসাধনায় অনন্য অবদান

পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক ছতুরাভী (রহ.) শুধু একজন আধ্যাত্মিক সাধকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ গবেষক, লেখক ও ইসলামী চিন্তাবিদ। তাঁর প্রিয় মুর্শিদ হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রহ.)-এর প্রত্যক্ষ নির্দেশেই তিনি ইসলামী সাহিত্য রচনা ও জ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল—বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম সমাজের কাছে বিশুদ্ধ আকিদা, তাসাউফ, শরীয়ত এবং মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনাদর্শকে সহজ, প্রাঞ্জল ও প্রামাণ্য ভাষায় তুলে ধরা।

তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • সেরাজুস সালেকীন — তরিকতের শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক সাধনার একটি মূল্যবান গ্রন্থ।
  • সায়্যিদুল মুরসালীন (তিন খণ্ড) — মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবন, চরিত্র ও আদর্শ নিয়ে রচিত একটি সুবৃহৎ ও গবেষণাধর্মী জীবনীগ্রন্থ।
  • মুনাব্বিহাত — হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর বিখ্যাত গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ।
  • গুনচা-ই-ফারসী
  • দুররাতুল আদাব
  • সহজ আরবি ব্যাকরণ

এসব গ্রন্থের মধ্যে কয়েকটি দীর্ঘদিন দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসার পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ছেরাজুছ্ ছালেকীন

Original price was: ৳ 390.Current price is: ৳ 310.
In Stock
Add to Wishlist
Add to Wishlist

‘সায়্যিদুল মুরসালীন’ : বাংলা ভাষায় এক অনন্য সংযোজন

পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.)-এর অমর কীর্তির অন্যতম হলো ‘সায়্যিদুল মুরসালীন’

প্রথমে দুই খণ্ডে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি পরবর্তীতে তিন খণ্ডে পূর্ণতা লাভ করে। বাংলা ভাষায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবন নিয়ে রচিত অন্যতম প্রামাণ্য ও গবেষণাধর্মী গ্রন্থ হিসেবে এটি বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।

বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল হাই তাঁদের ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে এ বই সম্পর্কে মন্তব্য করেন—

“মাওলানা আব্দুল খালেক এম.এ. রচিত ‘সায়্যিদুল মুরসালীন’ অধুনা প্রকাশিত জীবনীগ্রন্থসমূহের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ বিরাট গ্রন্থ রচনায় লেখকের অসাধারণ শ্রম, গভীর গবেষণা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।”

এই মূল্যায়নই তাঁর গবেষণার গভীরতা ও সাহিত্যিক দক্ষতার উজ্জ্বল প্রমাণ।

ইসলামী সাহিত্য আন্দোলনের ধারাবাহিকতা

পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.) নিজে গ্রন্থ রচনা করেই ক্ষান্ত হননি; তিনি তাঁর খলিফা ও শিষ্যদেরও ইসলামী সাহিত্য রচনায় উৎসাহিত করেন।

তাঁর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় অসংখ্য গবেষণাধর্মী ও প্রামাণ্য গ্রন্থ রচিত হয়, যা বাংলা ভাষায় ইসলামী জ্ঞানচর্চাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • শায়খ মুহাম্মদ বোরহানুদ্দীন উয়েসী (রহ.)-এর “আখেরী নবী”, যেখানে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)-এর শেষ নবী হওয়ার সব দলিল সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
  • অধ্যাপক এ.এফ.এম. আবদুল আজীয এবং সিদ্দিক আহমদ খান (রহ.)-এর গবেষণাগ্রন্থ “হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (র.)-এর জীবন ও কর্ম”, যা ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত হয়ে বাংলা ভাষায় মুজাদ্দিদী দর্শন প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রধান খলিফাবৃন্দ ও তাঁদের অবদান

শায়খ সাইয়্যিদ বোরহানুদ্দীন উয়েসী (রহ.)

পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.)-এর সর্বপ্রথম এবং প্রধান খলিফা ছিলেন শায়খ সাইয়্যিদ বোরহানুদ্দীন উয়েসী (রহ.)।

তিনি ১৯৪৮ সালে পীর কেবলার হাতে বায়আত গ্রহণ করেন। বায়আতের পর থেকেই কঠোর রিয়াজত, ইবাদত, গবেষণা এবং আত্মশুদ্ধির সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। একই বছর পীর কেবলার সঙ্গে প্রথম হজ পালন করেন এবং মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই খিলাফত লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। ১৯৫২ সালে দ্বিতীয়বারও তিনি তাঁর পীরের সফরসঙ্গী হিসেবে হজে অংশগ্রহণ করেন।

পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.) তাঁর সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্চ মূল্যায়ন করে এক পত্রে লিখেছিলেন—

“সূফী বোরহানউদ্দীন সাহেব হযরত দাদা পীর সাহেব (রহ.)-এর কদমে কদম মিলিয়ে চলিতেছেন…”

এই চিঠিতে তাঁর দ্বীনি খেদমত, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, আত্মত্যাগ এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য বিশেষ দোয়াও করা হয়।

নেদায়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা

পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.)-এর নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে শায়খ বোরহানুদ্দীন উয়েসী (রহ.) ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “নেদায়ে ইসলাম”

এটি ছিল কেবল একটি ধর্মীয় সংগঠন নয়; বরং শিক্ষা, সমাজসেবা, মানবকল্যাণ ও ইসলামী দাওয়াহর একটি বহুমাত্রিক আন্দোলন।

ক্রমে নেদায়ে ইসলামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়—

  • অসংখ্য কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসা
  • এতিমখানা
  • মুসাফিরখানা
  • হাসপাতাল
  • মহিলা মাদ্রাসা
  • কামিল পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
  • কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্র
  • কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি
  • যুব উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণ

এছাড়াও মিশরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে একটি আন্তর্জাতিক মানের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছিল।

এই সব উদ্যোগের মাধ্যমে নেদায়ে ইসলাম বাংলাদেশের শিক্ষা, সমাজকল্যাণ এবং ইসলামী দাওয়াহর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

আধ্যাত্মিক সাধনার নতুন দিগন্ত

পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.)-এর রূহানী তাওয়াজ্জুহ, দোয়া এবং দিকনির্দেশনায় শায়খ বোরহানুদ্দীন উয়েসী (রহ.) দীর্ঘ সাধনা ও গবেষণার মাধ্যমে বিশেষ আধ্যাত্মিক অগ্রগতি অর্জন করেন।

তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)-এর খাস দান হিসেবে “আহমাদিয়া তরিকা” লাভ করেন। এই সাধনাপদ্ধতিতে একাদশ লতিফা এবং সুলতানুল আজকার কুবরা-র মতো বিশেষ আধ্যাত্মিক বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়।

পরবর্তীকালে এই বিষয়গুলোর ওপর গবেষণা পরিচালিত হয় এবং উপমহাদেশের বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. শমসের আলী এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন বলে উৎসগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।

অন্যান্য বিশিষ্ট খলিফা ও মুরিদ

পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.)-এর প্রায় পঁচিশজন খলিফার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—

  • সূফী খোন্দকার আব্দুল জব্বার (রহ.)
  • অধ্যাপক এ.এফ.এম. আব্দুল আজীয (রহ.)
  • সূফী ফাতেহ আলী (রহ.)
  • সূফী সিদ্দিক আহমদ খান (রহ.)

তাঁর বিশিষ্ট মুরিদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ (রহ.)

কবি ফররুখ আহমদ একসময় বস্তুবাদী ও কমিউনিস্ট দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। বহু যুক্তি, আলোচনা ও জ্ঞানগর্ভ বিতর্কের মাধ্যমে পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.) তাঁকে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এর ফলেই কবির জীবনে ঘটে আমূল পরিবর্তন।

পরবর্তীতে ফররুখ আহমদ তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সিরাজুম মুনীরা’ তাঁর প্রিয় মুর্শিদ পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.)-এর প্রতি উৎসর্গ করেন। কবির কন্যা সাহিত্যিক সাইয়্যিদা ইয়াসমিন বানুও তাঁর পিতার এই আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের পেছনে পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.)-এর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।

বাণী, ইন্তেকাল ও উত্তরাধিকার

হৃদয় জাগ্রত করার বাণী

পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক ছতুরাভী (রহ.) ছিলেন এমন একজন আলেম ও আধ্যাত্মিক সাধক, যাঁর বক্তৃতা শিক্ষিত ও সাধারণ—উভয় শ্রেণির মানুষের হৃদয় স্পর্শ করত। তাঁর ভাষণে থাকত আত্মশুদ্ধি, আল্লাহভীতি, মানবকল্যাণ এবং জ্ঞানের সুষম সমন্বয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল বাহ্যিক শিক্ষা নয়; বরং অন্তরের পরিশুদ্ধিই মানুষের প্রকৃত মুক্তির পথ।

তাঁর একটি বিখ্যাত বক্তব্যে তিনি বলেন—

“আপনারা চোখের যে ক্ষুদ্র অংশ দিয়ে পৃথিবীকে দেখেন, তার পরিমাণ এক ইঞ্চির চৌদ্দ ভাগের এক ভাগ মাত্র। অথচ এই সামান্য অংশ দিয়েই আপনারা আকাশ, পৃথিবী ও অসংখ্য সৃষ্টি অবলোকন করতে সক্ষম হন। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে এমন একটি শক্তি নিহিত রয়েছে, যা পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করতে পারলে আল্লাহর ইচ্ছায় জগতের গভীরতম সত্যও উপলব্ধি করা সম্ভব।”

আরেকটি বক্তব্যে তিনি প্রকৃত শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন—

“যে শিক্ষা কেবল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটায়, কিন্তু হৃদয়কে শুষ্ক করে দেয়—সে শিক্ষা মানুষের প্রকৃত মুক্তি দিতে পারে না। বরং যে শিক্ষা মস্তিষ্ক ও হৃদয়—উভয়েরই বিকাশ ঘটায়, আল-কুরআনের আদর্শে মানুষকে গড়ে তোলে এবং আত্মিক পবিত্রতা অর্জনের পথ দেখায়, সেটিই প্রকৃত শিক্ষা।”

তাঁর এসব বক্তব্যে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়—জ্ঞান, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বিত দর্শন।

সমাজ ও রাষ্ট্রে তাঁর প্রভাব

পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ.) কেবল খানকাহ বা শিক্ষাঙ্গনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি সমাজ ও রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়েও ইসলামের সৌন্দর্য ও মানবিক আদর্শ তুলে ধরেছিলেন।

তাঁর কাছে যেমন সাধারণ মানুষ দিকনির্দেশনা গ্রহণের জন্য আসতেন, তেমনি রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও তাঁর সান্নিধ্যে আসতেন। উৎসগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদসহ বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি তাঁর বক্তব্যে প্রভাবিত হন। এছাড়া আই.সি.এস. কর্মকর্তা ডি. কে. পাওয়ার তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণ করে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ‘দাউদ খালেদ পাওয়ার’ নাম ধারণ করেন।

এ থেকে বোঝা যায়, তাঁর দাওয়াহ কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং শিক্ষিত, প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী মহলেও সমানভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল।

ইন্তেকাল

দীর্ঘ কর্মময় জীবনে তিনি ইলম, তাবলিগ, তাসাউফ এবং মানবকল্যাণে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিবেদিত রাখেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ অনুসরণের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর ও আন্তরিক।

৬৩ বছর বয়সে, ১৯৫৫ সালের ২ এপ্রিল (৮ শাবান ১৩৭৪ হিজরি, ১৯ চৈত্র ১৩৬২ বঙ্গাব্দ) তিনি ইন্তেকাল করেন।

জানাজা ও দাফন

তাঁর প্রথম জানাজা ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের প্রথম খতিব, আওলাদে রাসূল মাওলানা মুফতি আমীমুল এহসান মুজাদ্দেদী (রহ.)।

এই জানাজায় শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীসহ তৎকালীন সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষা জগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে তাঁর ওসিয়ত এবং আধ্যাত্মিক নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁর প্রিয়তম খলিফা শায়খ সাইয়্যিদ বোরহানুদ্দীন উয়েসী (রহ.) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছতুরায় উপস্থিত হয়ে দ্বিতীয় জানাজার ইমামতি করেন।

হাজার হাজার মুরিদ, ভক্ত ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা সম্পন্ন হয় এবং ছতুরা শরীফে তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা সংলগ্ন স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

উত্তরাধিকার

ইন্তেকালের পরও তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা, গবেষণা, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং ইসলামী দাওয়াহর ধারা অব্যাহত রয়েছে।

তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ আজও ইসলামী গবেষক, আলেম ও শিক্ষার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আধ্যাত্মিক সিলসিলা, খলিফাবৃন্দ এবং তাঁদের মাধ্যমে পরিচালিত শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রম বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

ছতুরা শরীফে অবস্থিত তাঁর মাযার শরীফ আজও অসংখ্য ভক্ত, অনুসারী ও গবেষকের গন্তব্য। প্রতিবছর ৪ ফাল্গুন (প্রচলিত আয়োজনে) তাঁর মাযার সংলগ্ন মসজিদ প্রাঙ্গণে ইসালে সওয়াব মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

তাঁর ইন্তেকালের পর ঢাকার মাসিক “মাহেনও” পত্রিকায় তাঁকে স্মরণ করে লেখা হয়েছিল—

“একজন জ্ঞানী-গুণী, আদর্শবাদী, ধর্মপরায়ণ ও সাধু ব্যক্তি হিসেবে তাঁর মর্যাদা ছিল প্রশ্নাতীত। বাগ্মী ও লেখক হিসেবেও তিনি ছিলেন সুপরিচিত।”

এই মূল্যায়ন তাঁর বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব ও অবদানের যথার্থ স্বীকৃতি বহন করে।

তথ্যসূত্র

১. জীবনী: হযরত শাহ সূফী অধ্যাপক আব্দুল খালেক (রহ.) — সিদ্দিক আহমদ খান।

২. ফুরফুরা শরীফের ইতিবৃত্ত — মুবারক আলী রহমানী।

৩. ফুরফুরার ইতিহাস — সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল আরিফ।

৪. ইসলাম প্রসঙ্গ — ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

৫. আখেরী নবী (সা.)হাদিয়াতুস সালেকীন — আল্লামা শায়খ মুহাম্মদ বোরহানুদ্দীন (রহ.)।

৬. কবি ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি — সম্পাদনা: শাহাবুদ্দিন আহমদ।

৭. সায়্যিদুল মুরসালীন (তৃতীয় খণ্ড) — অধ্যাপক আব্দুল খালেক (রহ.)।

৮. ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ইতিবৃত্ত — সম্পাদনা: শোয়েব চৌধুরী।